
নতুন করে ইরানে দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দফার এ হামলায় কয়েকজন নিহত এবং ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে বলে জানা গেছে। এর প্রেক্ষিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত ৪ মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান।
তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলুর খবরে বলা হয়, ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানের সিরিক শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় অন্তত দুজন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন।
ইরানের কোনারাক কাউন্টি এবং জাস্ক ও বন্দর লেঙ্গেহ শহরও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জিরোফতে একটি বেসামরিক বিমানবন্দরেও হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজগান প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের পূর্ব দিকেও বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
এছাড়া কেশম দ্বীপের মাসান গ্রামের আশপাশে পাঁচটির বেশি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির দিক থেকেও আরও চারটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে আইআরআইবি।
বৃহত্তর হামলার অংশ হিসেবে ইরানের সরকারি মালিকানাধীন দুটি ট্যাংকারেও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে বলে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানের ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ঘটনা এটিই প্রথম।
এই অভিযানের বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা, রাডার ব্যবস্থা, সামুদ্রিক সম্পদ ও স্থাপনা, মাইন স্থাপনের সক্ষমতা এবং যোগাযোগ স্থাপনা রয়েছে।
আল জাজিরা বলছে, ইরানজুড়ে ব্যাপক হামলার পর পাল্টা হামলা শুরু করেছে তেহরানও। এর অংশ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের জর্ডান, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার রাতে এসব হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।
জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে দীর্ঘপাল্লার আরকিউ-৪ এবং এমকিউ-৯ ড্রোন থাকা হ্যাঙ্গারগুলোকে লক্ষ্য করে একটি ‘ভারী’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি। আইআরআইবিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, এই হামলায় কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। বেশ কয়েকজন মার্কিন ফ্লাইট ও কারিগরি কর্মী নিহত হয়েছেন। কারিগরি অবকাঠামোর কয়েকটি অংশে আগুন ধরে গেছে। তবে হামলায় কোনো ধরনের হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানি ভূখণ্ড থেকে উৎক্ষেপণ করা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করে। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ধ্বংস করে দেয়।
জর্ডানের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির সামরিক মুখপাত্র বলেন, অবশিষ্ট তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র লোকালয় থেকে দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পড়েছে। এতে কোনো হতাহত বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
উত্তর ইরাকের এরবিল প্রদেশে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনায় সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোরও কথা জানিয়েছে আইআরজিসি। আইআরজিসির দাবি, হামলায় একটি মেরামত কেন্দ্র, কারিগরি সরঞ্জাম থাকা গুদাম এবং মার্কিন নজরদারি বেলুনের একটি গাইডেন্স সিস্টেম ধ্বংস হয়েছে। বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, হামলায় ঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংকে আগুন ধরে যায় এবং বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
এদিকে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘শত্রু ড্রোন’ হামলা প্রতিহত করেছে। এই ঘটনাকে তারা ইরানের আগ্রাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে কুয়েত সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানায়, যেসব বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, তা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কর্তৃক ড্রোন ভূপাতিত করার ফলে হয়েছে।
ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম দেশটির সেনাবাহিনীর এক বিবৃতির বরাতে জানিয়েছে, বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকা এলাকা এবং রাডার স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে এক ঝাঁক ড্রোন ছোড়া হয়েছে।
সেনাবাহিনী জানায়, এই হামলাটি তাদের ‘অপারেশন থান্ডার’ নামক সামরিক অভিযানের ২৯তম ধাপের অংশ। তাদের দাবি অনুযায়ী, শেখ ঈসা ঘাঁটিটি পারস্য উপসাগরে মার্কিনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যা হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণ, ড্রোনের যন্ত্রপাতি ও নজরদারি উড়োজাহাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।